বাংলা ভাষায় মাছ-ব্যাঙ-সাপ ও পোকামাকড়চর্চা
Product details
দীপককুমার দাঁ
৮০ পাতা
পেপারব্যাক
গোবরডাঙা গবেষণা পরিষৎ
এই বইটির কাহিনি শুরু হয় আজ থেকে এক দশকেরও বেশি সময় আগে, ২০১৩ সালে। সেই সময় ‘বাংলা ভাষায় পাখিচর্চা’ শিরোনামে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলা ভাষায় পক্ষীবিজ্ঞান নিয়ে যত বই বা প্রবন্ধ লেখা হয়েছে, তার একটি সুসংগত তালিকা তৈরি করা। লেখক চেয়েছিলেন এই কাজের মাধ্যমে প্রকৃতিপ্রেমীদের মধ্যে একটি গঠনমূলক আলোচনার পরিবেশ তৈরি হোক—কারা লিখছেন, কী ধরনের কাজ হচ্ছে, বা সেই লেখার গুণমান কেমন, তা নিয়ে ব্যবচ্ছেদ চলুক। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বইটি সমাদৃত হলেও সেই কাঙ্ক্ষিত আলোচনার জোয়ার সেভাবে ওঠেনি। দীর্ঘ দশ বছর পর ২০২৩ সালে বিশিষ্ট পক্ষী বিশেষজ্ঞ ডা. কণাদ বৈদ্যের সহায়তায় যখন এর বর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হল, তখনও অভিজ্ঞতার খুব একটা বদল ঘটেনি। সমাজের একটি বড় অংশ আজও অন্যের কাজের মূল্যায়ন বা গঠনমূলক আলোচনায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি, প্রত্যেকেই যেন কেবল নিজের ব্যক্তিগত গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ।
এই নীরবতার মাঝেই গোবরডাঙা গবেষণা পরিষদের সমৃদ্ধ লাইব্রেরির সহযোগিতায় লেখক ও তাঁর সহকর্মীরা তাঁদের দ্বিতীয় বড় কাজটিতে হাত দেন, যার বিষয়বস্তু ছিল বাংলা ভাষায় মাছ, ব্যাঙ, সাপ ও পোকামাকড় চর্চার ইতিহাস। এই সংকলনটি কেবল একটি তালিকা নয়, বরং বাংলার জল-জঙ্গলের বৈচিত্র্যের এক দালিলিক আখ্যান। বাঙালির প্রিয় ‘মাছ’ নিয়ে সাহিত্যের আঙিনায় অনেক কথা হলেও জনপ্রিয় বিজ্ঞানের ধারায় এর চর্চার বিবর্তন এই বইতে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে স্কুল পাঠ্যে মৎস্যচাষ অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় একসময় প্রচুর বই প্রকাশিত হয়েছিল, কিন্তু ২০০০ সাল নাগাদ নিয়মের পরিবর্তনে সেই জোয়ারে ভাটা পড়ে। আজ পশ্চিমবাংলার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে জলাভূমি ভরাট হচ্ছে, ফলে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অনেক দেশি চুনো মাছ। লেখক অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে জানিয়েছেন যে, আধুনিক মৎস্যচাষিরাও আজ আর বই পড়ে জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজন বোধ করেন না। অথচ একদা সত্যচরণ লাহা সম্পাদিত ‘প্রকৃতি’ পত্রিকায় ড. একেন্দ্রনাথ ঘোষ বা পরবর্তীকালে গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য ও হীরালাল চৌধুরীদের মতো ব্যক্তিত্বরা এই মৎস্যবিজ্ঞানের ধারাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন।
বইটির পাতায় পাতায় উঠে এসেছে সাপের মতো রহস্যময় এক প্রাণীর কথা এবং আমাদের সমাজে তাকে ঘিরে থাকা অন্ধবিশ্বাসের গল্প। সারা বিশ্বে সাপে কামড়ে মৃত্যুর তালিকায় পশ্চিমবঙ্গ যে প্রথম সারিতে, তার প্রধান কারণ হিসেবে লেখক দায়ী করেছেন ওঝা-গুনিন ও কুসংস্কারকে। তবে আশার কথা এই যে, ইদানীং একদল তরুণ পরিবেশকর্মী অত্যন্ত সাহসের সাথে লোকালয় থেকে সাপ উদ্ধার করে তাদের প্রাকৃতিক আবাসে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। এই আন্দোলনের নেপথ্যে অবণীভূষণ ঘোষ, দীপক মিত্র বা ড. অমিয়কুমার হাটির মতো বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের অবদানের কথা এখানে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাঙের বিপন্ন অবস্থা এবং কীটপতঙ্গের বিশাল ও অজানা জগতের প্রতিও আলোকপাত করা হয়েছে। সাত লক্ষেরও বেশি প্রজাতির কীটপতঙ্গের মধ্যে আমাদের জানাশোনা খুবই সামান্য। এই ক্ষেত্রে গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের সেই অমর সৃষ্টি ‘বাংলার কীটপতঙ্গ’ বা ‘বাংলার মাকড়সা’-র উত্তরাধিকার বহন করে আজও যারা কাজ করে চলেছেন, তাঁদের সবার প্রচেষ্টাকে এই বইয়ে এক সুতোয় গাঁথা হয়েছে।
পরিশেষে, এই বইটি একটি বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেয়—মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার আন্দোলন। লেখক বিশ্বাস করেন, তথ্য বিপ্লবের এই যুগে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ না করে একে অপরের কাজের খবর রাখা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে জ্ঞানরাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এই সংকলনটি প্রমাণ করতে চায় যে, বাংলা ভাষা কেবল অনুবাদের মাধ্যম নয়, বরং মৌলিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবেও সমান শক্তিশালী হতে পারে। গোবরডাঙা গবেষণা পরিষদের নিভৃত লাইব্রেরিতে বসে তরুণ রায় ও শুভ্রা বৈদ্যের সহায়তায় তৈরি হওয়া এই আকর গ্রন্থটি আসলে বাংলা ভাষায় জনপ্রিয় বিজ্ঞানের জয়গান গাওয়ার এক নিরলস প্রচেষ্টা, যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে প্রকৃতির মণিমুক্তো পৌঁছে দিতে চায়।
Product details
দীপককুমার দাঁ
৮০ পাতা
পেপারব্যাক
গোবরডাঙা গবেষণা পরিষৎ
এই বইটির কাহিনি শুরু হয় আজ থেকে এক দশকেরও বেশি সময় আগে, ২০১৩ সালে। সেই সময় ‘বাংলা ভাষায় পাখিচর্চা’ শিরোনামে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলা ভাষায় পক্ষীবিজ্ঞান নিয়ে যত বই বা প্রবন্ধ লেখা হয়েছে, তার একটি সুসংগত তালিকা তৈরি করা। লেখক চেয়েছিলেন এই কাজের মাধ্যমে প্রকৃতিপ্রেমীদের মধ্যে একটি গঠনমূলক আলোচনার পরিবেশ তৈরি হোক—কারা লিখছেন, কী ধরনের কাজ হচ্ছে, বা সেই লেখার গুণমান কেমন, তা নিয়ে ব্যবচ্ছেদ চলুক। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বইটি সমাদৃত হলেও সেই কাঙ্ক্ষিত আলোচনার জোয়ার সেভাবে ওঠেনি। দীর্ঘ দশ বছর পর ২০২৩ সালে বিশিষ্ট পক্ষী বিশেষজ্ঞ ডা. কণাদ বৈদ্যের সহায়তায় যখন এর বর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হল, তখনও অভিজ্ঞতার খুব একটা বদল ঘটেনি। সমাজের একটি বড় অংশ আজও অন্যের কাজের মূল্যায়ন বা গঠনমূলক আলোচনায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি, প্রত্যেকেই যেন কেবল নিজের ব্যক্তিগত গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ।
এই নীরবতার মাঝেই গোবরডাঙা গবেষণা পরিষদের সমৃদ্ধ লাইব্রেরির সহযোগিতায় লেখক ও তাঁর সহকর্মীরা তাঁদের দ্বিতীয় বড় কাজটিতে হাত দেন, যার বিষয়বস্তু ছিল বাংলা ভাষায় মাছ, ব্যাঙ, সাপ ও পোকামাকড় চর্চার ইতিহাস। এই সংকলনটি কেবল একটি তালিকা নয়, বরং বাংলার জল-জঙ্গলের বৈচিত্র্যের এক দালিলিক আখ্যান। বাঙালির প্রিয় ‘মাছ’ নিয়ে সাহিত্যের আঙিনায় অনেক কথা হলেও জনপ্রিয় বিজ্ঞানের ধারায় এর চর্চার বিবর্তন এই বইতে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে স্কুল পাঠ্যে মৎস্যচাষ অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় একসময় প্রচুর বই প্রকাশিত হয়েছিল, কিন্তু ২০০০ সাল নাগাদ নিয়মের পরিবর্তনে সেই জোয়ারে ভাটা পড়ে। আজ পশ্চিমবাংলার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে জলাভূমি ভরাট হচ্ছে, ফলে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অনেক দেশি চুনো মাছ। লেখক অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে জানিয়েছেন যে, আধুনিক মৎস্যচাষিরাও আজ আর বই পড়ে জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজন বোধ করেন না। অথচ একদা সত্যচরণ লাহা সম্পাদিত ‘প্রকৃতি’ পত্রিকায় ড. একেন্দ্রনাথ ঘোষ বা পরবর্তীকালে গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য ও হীরালাল চৌধুরীদের মতো ব্যক্তিত্বরা এই মৎস্যবিজ্ঞানের ধারাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন।
বইটির পাতায় পাতায় উঠে এসেছে সাপের মতো রহস্যময় এক প্রাণীর কথা এবং আমাদের সমাজে তাকে ঘিরে থাকা অন্ধবিশ্বাসের গল্প। সারা বিশ্বে সাপে কামড়ে মৃত্যুর তালিকায় পশ্চিমবঙ্গ যে প্রথম সারিতে, তার প্রধান কারণ হিসেবে লেখক দায়ী করেছেন ওঝা-গুনিন ও কুসংস্কারকে। তবে আশার কথা এই যে, ইদানীং একদল তরুণ পরিবেশকর্মী অত্যন্ত সাহসের সাথে লোকালয় থেকে সাপ উদ্ধার করে তাদের প্রাকৃতিক আবাসে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। এই আন্দোলনের নেপথ্যে অবণীভূষণ ঘোষ, দীপক মিত্র বা ড. অমিয়কুমার হাটির মতো বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের অবদানের কথা এখানে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাঙের বিপন্ন অবস্থা এবং কীটপতঙ্গের বিশাল ও অজানা জগতের প্রতিও আলোকপাত করা হয়েছে। সাত লক্ষেরও বেশি প্রজাতির কীটপতঙ্গের মধ্যে আমাদের জানাশোনা খুবই সামান্য। এই ক্ষেত্রে গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের সেই অমর সৃষ্টি ‘বাংলার কীটপতঙ্গ’ বা ‘বাংলার মাকড়সা’-র উত্তরাধিকার বহন করে আজও যারা কাজ করে চলেছেন, তাঁদের সবার প্রচেষ্টাকে এই বইয়ে এক সুতোয় গাঁথা হয়েছে।
পরিশেষে, এই বইটি একটি বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেয়—মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার আন্দোলন। লেখক বিশ্বাস করেন, তথ্য বিপ্লবের এই যুগে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ না করে একে অপরের কাজের খবর রাখা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে জ্ঞানরাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এই সংকলনটি প্রমাণ করতে চায় যে, বাংলা ভাষা কেবল অনুবাদের মাধ্যম নয়, বরং মৌলিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবেও সমান শক্তিশালী হতে পারে। গোবরডাঙা গবেষণা পরিষদের নিভৃত লাইব্রেরিতে বসে তরুণ রায় ও শুভ্রা বৈদ্যের সহায়তায় তৈরি হওয়া এই আকর গ্রন্থটি আসলে বাংলা ভাষায় জনপ্রিয় বিজ্ঞানের জয়গান গাওয়ার এক নিরলস প্রচেষ্টা, যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে প্রকৃতির মণিমুক্তো পৌঁছে দিতে চায়।
Sort by
Newest first
Newest first
Oldest first
Highest rated
Lowest rated
Ratings
All ratings
All ratings
5 Stars
4 Stars
3 Stars
2 Stars
1 Star