হাজার বছরের ভারতীয় দর্শন
হাজার বছরের ভারতীয় দর্শন
Product details
দেবজ্যোতি গঙ্গোপাধ্যায়
২২৭ পাতা
হার্ড কভার
জয়ঢাক
'ভারতীয় বিজ্ঞানের ইতিহাস' রচনার কাজ শেষ করে লেখক যখন নতুন এক জ্ঞান-যাত্রার পরিকল্পনা করছিলেন, তখন তাঁর মনের মণিকোঠায় দানা বাঁধছিল এক হাজার বছরের দীর্ঘ এক দার্শনিক আখ্যান। এটি কেবল দিনক্ষণ বা সালতামামির খতিয়ান নয়, বরং হাজার বছরের জারিত সময় আর প্রজ্ঞার সঙ্গে লেখকের এক নিবিড় ব্যক্তিগত বোঝাপড়ার ইতিবৃত্ত। ভারতবর্ষের এই জ্ঞানচর্চার ইতিহাস এক আশ্চর্য বহমান নদীর মতো, যা সুদূর প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে আজও নানা স্তরে প্রবহমান। যেখানে সমসাময়িক মায়া, মিশরীয় বা সুমেরীয় সভ্যতা কালের নিয়মে ধুয়ে মুছে গেছে, সেখানে ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরা অসংখ্য বিপর্যয় আর বিস্মৃতির পাহাড় ডিঙিয়েও নিজের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। লেখক আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, কোনো জ্ঞানই নিশ্ছিদ্র গণ্ডির মধ্যে বেড়ে ওঠে না; বরং মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে 'জ্ঞান' নামক সেই নিরাবয়ব বস্তুটি দেশ থেকে দেশান্তরে যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়ায়।
এই গল্পের শুরুটা ছিল আরও প্রাচীন, যখন মানুষের অভিজ্ঞতার ভাঁড়ার ছিল অস্থায়ী আর পুঁজি ছিল কেবল বিশ্বাস। এক সময় ছিল যখন সভ্যতার চাকা চললেও লেখার চল হয়নি। বৌদ্ধ বা ব্রাহ্মণ্য দর্শনের যে গম্ভীর তত্ত্ব আজ আমরা দু'মলাটের বইতে পাই, তা এক সময় টিকে ছিল কেবল মানুষের স্মৃতি আর মুখে মুখে ঘোরা সংলাপে। বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের কয়েকশো বছর পর যখন প্রথম বই লেখা শুরু হলো, তার অনেক আগে থেকেই পাণিনি বা যাস্কের ব্যাকরণ আর জ্যোতিষ চর্চা পূর্ণতা পেয়েছিল। লেখক পাঠককে নিয়ে যান সেই ধুলো ওড়ানো পথে, যেখানে পরিব্রাজক শ্রমণরা মুক্তির খোঁজে অবিরাম পথ চলতেন আর পথে-প্রবাসে শুনিয়ে যেতেন দর্শনের গল্প। রাজগীরের পাহাড়চূড়া থেকে নালন্দার আমবাগান কিংবা বৈশালীর কূটাগারশালা—সবখানেই বুদ্ধের সেই পরিযায়ী দর্শনকথা শ্রোতাদের স্মৃতিতে আশ্রয় নিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে হস্তান্তরিত হয়েছে।
লেখকের এই পথচলা কেবল গ্রন্থাগারের তাকে সীমাবদ্ধ থাকেনি। গত তিন দশক ধরে তিনি একলা এবং অনেককে সঙ্গে নিয়ে চষে বেরিয়েছেন নালন্দা, বেনারস, মিথিলা, কপিলাবস্তু আর হাজারিবাগের অলিগলি। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে তাঁর সঙ্গী হয়েছেন অগণিত পণ্ডিত, বিজ্ঞানী আর তত্ত্বজ্ঞানী মানুষ। কখনো ভাটপাড়ার পণ্ডিতমহল্লায় শ্রীজীব ন্যায়তীর্থের উত্তরসূরিদের সঙ্গে অতীতের স্মৃতিচারণ করেছেন, কখনো বা নালন্দা মহাবিহারের সাধারণ কর্মীদের আন্তরিক সেবায় নিমগ্ন থেকে খুঁজে ফিরেছেন প্রাচীন ভারতের জ্ঞান-অবশেষ। স্মৃতিপথে ভেসে আসা বিশ্ববন্ধু তর্কতীর্থ থেকে শুরু করে আধুনিক বিজ্ঞানশাস্ত্রী মিহির কুমার চক্রবর্তী কিংবা জন স্ট্যাচেলের মতো মানুষদের সঙ্গে কাটানো সেই সংলাপমুখর দিনগুলোই এই বইয়ের মূল উপজীব্য।
আজকের এই কৃত্রিম মেধা বা এআই-এর যুগে দাঁড়িয়ে লেখক যখন সেই আদি পূর্বজদের জ্ঞানবিশ্বের ভাঙচুরকে বোঝার চেষ্টা করেন, তখন তা এক বহুবর্ণী কোলাজ হয়ে ধরা দেয়। সিদ্ধার্থের ঘোড়া কন্থকের সেই দীর্ঘ লাফ দিয়ে অনোমা নদী পার হওয়া থেকে শুরু করে দ্বাদশ শতকের মিথিলার দার্শনিক নির্জনতা—সবই যেন লেখকের কলমে জীবন্ত হয়ে ওঠে। এই বই তাই কেবল দর্শনের ইতিহাস নয়, এটি হলো আধুনিক শিক্ষা আর প্রাচীন পুরাণের চুঁইয়ে পড়া নির্যাস। দেবজ্যোতি গঙ্গোপাধ্যায়ের কলমে এই আখ্যানটি তাঁর আগের 'ভারতীয় বিজ্ঞানের ইতিহাস' বইটির এক সার্থক পরিপূরক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা আসলে সময়ের পললভূমিতে দাঁড়িয়ে আমাদের শেকড়কে চেনার এক নিরন্তর কথোপকথন।
লেখেক পরিচিতি
ঝাড়খন্ডের হাজারিবাগে অধ্যাপনাসূত্রে দুদশকের বেশি কাটিয়ে ফেলা পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক দেবজ্যোতি গঙ্গোপাধ্যায়ের অন্যতম চর্চার বিষয় বিজ্ঞান ও দর্শনের কার্যকরী যোগসূত্রের খোঁজ। অধ্যাপক গঙ্গোপাধ্যায়ের এ-বিষয়ক কাজগুলি আন্তর্জাতিক পণ্ডিতমহলে বিশেষ সমাদৃত। সেই সূত্রে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভুবনের নানা অলিগলিতে অনুসন্ধান ও ভারতের বিজ্ঞানচর্চা সংক্রান্ত তাঁর গবেষণার ফলাফলগুলি নিয়ে এই বইটি বাংলাভাষায় প্রকাশিত হল।
ও সেন্টার ফর ফাউন্ডেশন স্টাডিজ, ব্যাঙ্গালোর এবং নালন্দায় অবস্থিত 'নবনালন্দা মহাবিহারের' সহায়তায় তিনি গড়ে তুলেছেন 'নালন্দা ডায়লগ মিশন' যা দেশ-বিদেশের বিজ্ঞানী দার্শনিকদের এক মুক্তমঞ্চ। ইতিমধ্যেই সেখান থেকে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে দু'খণ্ডে Nalanda Dialogue Series (Prolegomena Intercultural Dialogue, Vol. I, Identity in Buddhism and Quantum Theory, Vol.II), Navanalanda Mahavihara, Nalanda, 2023
Product details
দেবজ্যোতি গঙ্গোপাধ্যায়
২২৭ পাতা
হার্ড কভার
জয়ঢাক
'ভারতীয় বিজ্ঞানের ইতিহাস' রচনার কাজ শেষ করে লেখক যখন নতুন এক জ্ঞান-যাত্রার পরিকল্পনা করছিলেন, তখন তাঁর মনের মণিকোঠায় দানা বাঁধছিল এক হাজার বছরের দীর্ঘ এক দার্শনিক আখ্যান। এটি কেবল দিনক্ষণ বা সালতামামির খতিয়ান নয়, বরং হাজার বছরের জারিত সময় আর প্রজ্ঞার সঙ্গে লেখকের এক নিবিড় ব্যক্তিগত বোঝাপড়ার ইতিবৃত্ত। ভারতবর্ষের এই জ্ঞানচর্চার ইতিহাস এক আশ্চর্য বহমান নদীর মতো, যা সুদূর প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে আজও নানা স্তরে প্রবহমান। যেখানে সমসাময়িক মায়া, মিশরীয় বা সুমেরীয় সভ্যতা কালের নিয়মে ধুয়ে মুছে গেছে, সেখানে ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরা অসংখ্য বিপর্যয় আর বিস্মৃতির পাহাড় ডিঙিয়েও নিজের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। লেখক আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, কোনো জ্ঞানই নিশ্ছিদ্র গণ্ডির মধ্যে বেড়ে ওঠে না; বরং মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে 'জ্ঞান' নামক সেই নিরাবয়ব বস্তুটি দেশ থেকে দেশান্তরে যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়ায়।
এই গল্পের শুরুটা ছিল আরও প্রাচীন, যখন মানুষের অভিজ্ঞতার ভাঁড়ার ছিল অস্থায়ী আর পুঁজি ছিল কেবল বিশ্বাস। এক সময় ছিল যখন সভ্যতার চাকা চললেও লেখার চল হয়নি। বৌদ্ধ বা ব্রাহ্মণ্য দর্শনের যে গম্ভীর তত্ত্ব আজ আমরা দু'মলাটের বইতে পাই, তা এক সময় টিকে ছিল কেবল মানুষের স্মৃতি আর মুখে মুখে ঘোরা সংলাপে। বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের কয়েকশো বছর পর যখন প্রথম বই লেখা শুরু হলো, তার অনেক আগে থেকেই পাণিনি বা যাস্কের ব্যাকরণ আর জ্যোতিষ চর্চা পূর্ণতা পেয়েছিল। লেখক পাঠককে নিয়ে যান সেই ধুলো ওড়ানো পথে, যেখানে পরিব্রাজক শ্রমণরা মুক্তির খোঁজে অবিরাম পথ চলতেন আর পথে-প্রবাসে শুনিয়ে যেতেন দর্শনের গল্প। রাজগীরের পাহাড়চূড়া থেকে নালন্দার আমবাগান কিংবা বৈশালীর কূটাগারশালা—সবখানেই বুদ্ধের সেই পরিযায়ী দর্শনকথা শ্রোতাদের স্মৃতিতে আশ্রয় নিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে হস্তান্তরিত হয়েছে।
লেখকের এই পথচলা কেবল গ্রন্থাগারের তাকে সীমাবদ্ধ থাকেনি। গত তিন দশক ধরে তিনি একলা এবং অনেককে সঙ্গে নিয়ে চষে বেরিয়েছেন নালন্দা, বেনারস, মিথিলা, কপিলাবস্তু আর হাজারিবাগের অলিগলি। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে তাঁর সঙ্গী হয়েছেন অগণিত পণ্ডিত, বিজ্ঞানী আর তত্ত্বজ্ঞানী মানুষ। কখনো ভাটপাড়ার পণ্ডিতমহল্লায় শ্রীজীব ন্যায়তীর্থের উত্তরসূরিদের সঙ্গে অতীতের স্মৃতিচারণ করেছেন, কখনো বা নালন্দা মহাবিহারের সাধারণ কর্মীদের আন্তরিক সেবায় নিমগ্ন থেকে খুঁজে ফিরেছেন প্রাচীন ভারতের জ্ঞান-অবশেষ। স্মৃতিপথে ভেসে আসা বিশ্ববন্ধু তর্কতীর্থ থেকে শুরু করে আধুনিক বিজ্ঞানশাস্ত্রী মিহির কুমার চক্রবর্তী কিংবা জন স্ট্যাচেলের মতো মানুষদের সঙ্গে কাটানো সেই সংলাপমুখর দিনগুলোই এই বইয়ের মূল উপজীব্য।
আজকের এই কৃত্রিম মেধা বা এআই-এর যুগে দাঁড়িয়ে লেখক যখন সেই আদি পূর্বজদের জ্ঞানবিশ্বের ভাঙচুরকে বোঝার চেষ্টা করেন, তখন তা এক বহুবর্ণী কোলাজ হয়ে ধরা দেয়। সিদ্ধার্থের ঘোড়া কন্থকের সেই দীর্ঘ লাফ দিয়ে অনোমা নদী পার হওয়া থেকে শুরু করে দ্বাদশ শতকের মিথিলার দার্শনিক নির্জনতা—সবই যেন লেখকের কলমে জীবন্ত হয়ে ওঠে। এই বই তাই কেবল দর্শনের ইতিহাস নয়, এটি হলো আধুনিক শিক্ষা আর প্রাচীন পুরাণের চুঁইয়ে পড়া নির্যাস। দেবজ্যোতি গঙ্গোপাধ্যায়ের কলমে এই আখ্যানটি তাঁর আগের 'ভারতীয় বিজ্ঞানের ইতিহাস' বইটির এক সার্থক পরিপূরক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা আসলে সময়ের পললভূমিতে দাঁড়িয়ে আমাদের শেকড়কে চেনার এক নিরন্তর কথোপকথন।
লেখেক পরিচিতি
ঝাড়খন্ডের হাজারিবাগে অধ্যাপনাসূত্রে দুদশকের বেশি কাটিয়ে ফেলা পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক দেবজ্যোতি গঙ্গোপাধ্যায়ের অন্যতম চর্চার বিষয় বিজ্ঞান ও দর্শনের কার্যকরী যোগসূত্রের খোঁজ। অধ্যাপক গঙ্গোপাধ্যায়ের এ-বিষয়ক কাজগুলি আন্তর্জাতিক পণ্ডিতমহলে বিশেষ সমাদৃত। সেই সূত্রে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভুবনের নানা অলিগলিতে অনুসন্ধান ও ভারতের বিজ্ঞানচর্চা সংক্রান্ত তাঁর গবেষণার ফলাফলগুলি নিয়ে এই বইটি বাংলাভাষায় প্রকাশিত হল।
ও সেন্টার ফর ফাউন্ডেশন স্টাডিজ, ব্যাঙ্গালোর এবং নালন্দায় অবস্থিত 'নবনালন্দা মহাবিহারের' সহায়তায় তিনি গড়ে তুলেছেন 'নালন্দা ডায়লগ মিশন' যা দেশ-বিদেশের বিজ্ঞানী দার্শনিকদের এক মুক্তমঞ্চ। ইতিমধ্যেই সেখান থেকে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে দু'খণ্ডে Nalanda Dialogue Series (Prolegomena Intercultural Dialogue, Vol. I, Identity in Buddhism and Quantum Theory, Vol.II), Navanalanda Mahavihara, Nalanda, 2023